top of page

এক শরণার্থী কিশোরের স্মৃতিকথা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে - বাবার যুদ্ধ 

দশম পর্ব



আমার লেখা বই


আমাদের পিতা ছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর থ্রি উইং ( ব্যাটালিয়ন ) এর একটি কোম্পানি কমান্ডার ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে । উনার কর্মস্থল ছিল সিলেটের মীরের ময়দান এবং সুবিদ বাজারের মাঝামাঝি জামিয়া স্কুল এ অবস্থিত ( বর্তমান ব্লু বার্ড স্কুল , রেডিও স্টেশন এর বিপরিতে । উনি ছিলেন সদর দফতরে অবস্থিত রিজার্ভ কোম্পানি এর অধিনায়ক । সিলেট সহ সারা পূর্ব পাকিস্তান এর পরিস্থিথি উত্তাল এবং সব সামরিক এবং রাইফেলস বাহিনীর জনবল আশংকা করছিল একটি ষড়যন্ত্রের । কোম্পানির প্রায় সকল জওয়ান এবং অন্যান্য সদস্যরা ওনার পূর্ব পরিচিত । ওরা সবাই এসে ওনার কাছে করতে সূরু করলো অনেক কানাঘুষা । আব্বা অনেক ওয়াকিবহল ধরনের মানুষ - সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই দেখে আসছে উত্তাল রাজনৈতিক ঘটনাবলি । কলকাতা থেকে ১৯৪৬ সালে সপরিবারে পালিয়ে আসতে হয়েছিল কলকাতা - লেখাপড়া - প্রিয় স্কুল - এবং বন্ধুদের কে রাতের অন্ধকারে । কলকাতা রায়ট এর মধ্যখানে । তারপর পাকিস্তান এর জন্ম এবং তার ব্রাহ্মনবাড়িয়া কলেজের দিন গুলো, ভাষা আন্দোলন এবং পুলিসে যোগদান করা এবং ১৯৫৮ সাল থেকে আইয়ুব এবং ইয়াহিয়াদের মার্শাল ল' এর শাসন । 



আমার লেখা ইংরেজি বই


ই পি আর প্রতিষ্ঠা এবং তাদেরকে পুলিশ থেকে ই, পি আর এ চাকরী সেকোন্ডম্যানট দেওয়া এবং তার পর থেকেই দেখে আসছিল পশ্চিম পাকিস্তনিদের দাপট এবং বাঙ্গালিদের নিগৃহতার নিদারুণ শ্রেণীবিভেদ । ১৯৫৮ সাল থেকে ই, পি আরকে চরম ভাবে নিষ্পেষণ করে আসছিল পশ্চিম পাকিস্থানিরা । মার্শাল ল দিয়ে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল অনেক প্রতিশ্রুতি এবং ই, পি, আর কে ক্রমে ক্রমে গ্রাস করেছিল পাকিস্তান আর্মি । ই, পি, আর প্রতিষ্ঠার সকল আইন এবং অন্যান্য অধ্যাদেশকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিল আইয়ুব খানের মার্শাল ল । ই, পি, আর এর বাঙ্গালি জনবল অত্যন্ত খুব্দ ছিল পাঞ্জাবি আর পাঠানদের উপর । ১৯৫৮ সাল থেকেই চলে আসছিল এক সিস্টেমেটিক বৈষম্য । 


ছাত্র, জনতার আন্দোলনে সিলেট এর পরিস্থিথি উত্তাল । মিছিল, মিটিং , পিকেটিং এবং হরতালে সকল ধরনের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ব্যাহত । ই, পি, আর এর রিজার্ভ কোম্পানি প্রতহ্য শহরে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে । আবার কোম্পানির চার প্লাটুন চার টি কি পয়েন্টে মোতায়েন - একটি বন্দরবাজার, একটি কীন ব্রিজের পাসে সার্কিট হাউসের সামনে , একটি আলিয়া মাদ্রাসা এবং পুরানো মেডিক্যাল কলেজের সামনে মাতৃসদন রোডে এবং আব্বা থাকতেন মোবাইল ট্রুপ নিয়ে । 


আমার পিতা


৩ উইং ই পি আর এর উইং কম্যান্ডার ২৪  সে মার্চ রাতে হটাৎ সুবেদার ফজলূল হক চৌধুরী ডেকে বললেন চৌধুরী সাব গেট ইয়োর কোম্পানি রেডি। এন টি এম টু  ( নোটিস টু মুভ)  ইন টু আওয়ার । গো এন্ড ছিকওর শমশেরনগর এয়ার পোর্ট । আই এস  ডিউটি ( ইন্টারনাল সিকুরিটি ডিউটি ) । ওকে রিপোর্ট বাই টুমরো লাস্ট লাইট । টু আই ছি ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল উইল জয়েন ইউ সুন । বে রেডি টু রিসিভ হিম । টেক অল আভেলাবেল ম্যানপাওয়ার । থ্রি থ্রি টন ট্রাক এন্ড ওয়ান পিক আপ । ফার্স্ট লাইন পাউচ এমুইনিসন (১০০ রাউন্ড ) করে ।  গো এ এস এ পি । আপ কি উপর হামারা বহুত ভরসা হ্যাঁয় । ইয়ে শালা মালাউন লোগোকি ইয়ে সব বন্ধ হনা চাইয়ে। নেহি তো বহুত পস্তানা প্যাঁরে গি ইয়ে সব কাফির কো । এইসে লেসন দেনা হ্যাঁই তাক্রিবান কাভি বি ইয়ে  পাকিস্তান তোর নে কি আওয়াজ নিহে লে না প্যাঁয়ে -  আপনে শামযহে না মেরে বাত। যা বলা তাই কাজ - মনে মনে একটু খুশীও হল যে যাক হেড কোয়ার্টার থেকে বের হয়ে যেতে পারছি এটাই সৌভাগ্য বলতে হবে । ঐ পাঞ্জাবি  উইং কম্যান্ডার মেজরের কথায় মেজাজটা একদম খারাপ হয়ে গেলো - ২৪ বছর এক সাথে থেকেও ওরা ভাবছে আন্দোলন বাঙ্গালি হিন্দুরাই  করছে,  মসুল্মান না - অথবা ওদের চোখে আমরা এখনো পুরদমে মসুল্মান না ! মনে হচ্ছিল কষে একটা বাম  গালে  থাপ্পড় মারতে পারলে ভালো লাগত । ওর কথায় বুঝা গেলো পরিষ্কার ওরা আমাদের কতটা অবমাননার চোখে ও ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে । কোন কথা না বলে স্যালুট দিয়ে বেরিয়ে এসে প্লাটুন কম্যান্ডার ও কোম্পানি হাভিলদার মেজরকে ডেকে পাঠাল । ডেকে এনে সব বিফিং দিয়ে দিল ; এক ফাঁকে  রুমে যেয়ে পারসোনাল  পয়েন্ট থ্রি টু স্মিথ এন্ড ওয়েসন পিস্তলটা সাথে নিয়ে বেরিয়ে এসে ব্যাটম্যান  সিপাই বাতেনকে সব বেডিং এবং সুইটকেস আই এস ডিউটিতে যাবার জন্য তৈরি করার অর্ডার দিয়ে বেরিয়ে পরল সিভিল কাপড় পড়ে । একটা রিক্সা নিয়ে ব্লু বার্ড  স্কুল ৩ উইং ই পি আর  হেড কোয়ার্টার থেকে নিয়ে শহরে চলে গেলো - পরিস্তিতি জানার জন্য ।


আমার পিতার মেডেল


  অনেক রাতে ফিরে এসেই ঘুমিয়ে পরল সকাল রওনা দেবার জন্য ;  টাউন এ গুজব আর গুজব ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট খাদিমনগর এ ক্যাম্প করেছে - শহরে টহল দিচ্ছে অবিরত । জিন্দাবাজার এ মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ ; হাল্কা ১৪৪ ধারার মতো । রাত নয়টার ভিতর সব দোকান পাঠ বন্ধ। শহর প্রায় খালি - প্রাণহীন রিকাবিবাজার, মেডিকেল কলেজ, অ্যাম্বারখানা সব যেন কেমন থমথমে । 




 আখালিয়া থেকে তিন থ্রি টন ট্রাক  ভর্তি সৈনিক আর ও শেভ্রলে পিক আপ  এ চার জন আর সামনে ড্রাইভার রফিক ও চৌধুরী সাহেব  । জমাদার স্প্রিং গুল প্যারেড বুঝিয়ে দিল সর্ব ৯১ জনের কাফেলা নিয়ে ধীর গতিতে বের হয়ে গেলো - কোতে নায়েক ঝুম্মা খান একটু অস্ত্র শস্ত্র দিতে গড়িমসি করছিল - কোম্পানি কমান্ডারের ধমকে ঘাবড়ে গিয়ে সব দিয়ে দিল । রেশন উঠানো হল প্রায় ১৮ দিনের বাকিটা জুরি অথবা জুড়ি কোম্পানি থেকে নিয়ে আসতে পারবে - ২০ দিনের ফ্রেস এর পয়সা নগদ দিল উইং কোয়ার্টার মাসটার হাভিলদার তাজ মোহাম্মাদ ভাট - একটা বেয়াদব কিসিমের মানুষ সে একটা - । ঠিক সকাল ৮ - ১৫তে ওকে রিপোর্ট দিয়ে বের হয়ে গেলো ৩ উইং ই পি আর এর ব্রাভো কোম্পানি ৯১ জনকে নিয়ে থেকে গেলো ২১-২২ জন আর ছুটিতে ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে মিলিয়ে আরও ১০ জনের মত - ১৬ এবং ১৭ উইং নতুন দুটো ইউনিট দাঁড় করার সময় অনেক সৈনিক ঐ দুটো উইং চলে যাওয়াতে কোম্পানির লোকবল কম। সামনের পিক আপ এ চৌধুরী সাহেব আর শেষ থ্রি টনে জমাদার গুল ।


 শহর একদম ঠাণ্ডা - গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে - পুরাতন মেডিকেল কলেজ - চৌহাটটা মোড় ঘুরে জিন্দা বাজার - কোর্ট কাচারি এর পড় সরীসৃপের মত উঠে গেলো দেশ বিখ্যাত কিন ব্রিজে । রাস্তা খালি - পিচ ঢালা পথ শেষ ফেঞ্ছুগঞ্জের রাস্তায় হেরিংবোন খান্দা কন্দর পাড় হয়ে আস্তে আস্তে সহসা এগুতে থাকলো ফেঞ্ছুগঞ্জের উদ্দেশ্যে - ইচ্ছা করেই প্রধান সড়ক না নিয়ে এই পথে আসলো - রাস্তায় রোড ব্লক , গাছ ফেলে রেখে অনেক রাস্তাই তখন বন্ধ ছিল । অল্প রাস্তা তথাপিও মংলা বাজার স্টেশন পর্যন্ত আসতে লেগে গেলো প্রায় এক ঘণ্টা - সব গাড়ি থামিয়ে বিশ্রাম দিয়ে চা টা পান করে নিলো - আসে পাশের রাস্তার খোঁজ খবর ও সব জেনে নিলো। থমথমে পরিস্থিথি - সবার চোখেই কেমন যেন একটা আতঙ্ক আতঙ্ক ভাব । স্টেশন মাসটার এসে বললেন আখাউরা থেকে সায়েস্তাগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেন লাইন অনেক জায়গায় উঠিয়ে ফেলেছে । উত্তাল সময় বংগে । ফরহাদ হাভিলদার  মেজর জি ডেকে ক্যানে ক্যানে জিগ্যেস করলো ওরা কয়জন - হাঁতে গুনে বলল স্যার ১ জেসিও , তিন এন সি ও আর ছয় সেপাই পাঞ্জাবি, পাঠান, বালুচ আর বিহারি মিলিয়ে । ফিলিপ্স ছয় ব্যান্ডের রেডিও টা অনেক কষ্ট ক্রে অন করে সকাল ১০-৩০ বিবিসি মার্ক টালির সকালের খবরটা শুনার চেষ্টা করেও পারল না । ১১ টার সময় আবার যাত্রা শুরু করলো - দুই ঘণ্টায় আট নয়টা ব্যারিকেড সরিয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ আসল । 


গাড়ি গুলো দেখলেই হুর হুর করে লোক একত্র হয় আর স্লোগানে স্লোগানে এলাকাটাকে মুখরিত করে তুলছিল - সবাই মিলে কৃষক, বৃদ্ধ , আবাল বনিতা সবাই সরব। অত্যন্ত বিশাল বাজার এবং নদীর পাড় ঘেরে গড়ে উঠেছে এক নতুন শহর । টিনের দোতলা - তিনতলা আরত, গদিঘর, দোকান - নদীর ঘাটে অনেক নৌকা, লঞ্চ, বার্য আর কারগো জাহাজে জনাকীর্ণ । একটা রেস্তরাতে অফিসাররা মধ্যাহ্ ভোজন সেরে নিলো - সৈনিক আর সাথে প্যাক লাঞ্চ জাতীয় কিছু ছিল - কোম্পানি কোয়ার্টার মাসটার হাভিলদার গনি - অনেক বছর যাবত এই কোম্পানিতে - পুরানা ই পি আর এর প্রায় আনপর( লেখপড়া কম.)  জাতীয় কিন্তু অত্যন্ত পেশাদার সৈনিক  । ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে রাজনাগর ফেলে দুপুর সাড়ে টিন টায় শমশেরনগর এয়ার পোর্ট এ আসলেন অনারা । গেট খুলে দিল এম ও ডী সৈনিক দেখে মনে হল মণিপুরি বা ত্রিপুরা জাতীয় ।

 ম্যানেজার গোছের একটা লোক এসে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাল - সবার জায়গা  দেখিয়ে দিল - হাভিলদার মেজর ফরহাদ আর কিউ এম গনি লেগে গেলো থাকা, শোয়া, লঙ্গর ইত্যাদির জোগাড়ে।


 জানতে  পারল যে শহরের ডাক বাংলোতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট এসেছে - এই দিক এ আসে নাই এখনো ।


আব্বার ডাইরির পাতা থেকে নেওয়া - 


''ক্যাম্প সেট করে ফেলতে বললাম আমার লোকদের । ১৯৫৮ সাল থেকে কম্পানির অর্ধেকের এর বেশি জওয়ান এবং এন সি ও দের চিনি । ব্যাটমান বাতেন চৌধুরী কে বললাম আমার জন্য ওয়াচ টাওয়ার বেড রুম রেডি করতে । টাউন থমথমে । দোকান পাঠ খুবই তারাতারিই বন্ধ হয়ে গেছে । জমাদার সাফিন গুল ( স্প্রিং গুল বলে পরিচিত ) অনেক পুরানা বন্ধু সেও নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রদেশের পুলিশ থেকে ১৯৫৮ ই পি আর এ এসেছে । ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা টক টকে লাল চেহারা এক পাঞ্জাবি মেজর  উইং কমান্ডার রাতে ওর ক্যাম্পে মদ্যপ অবস্থায় এসে খুব বকা ঝকা করে ওকে অপমানিত করতে চেয়েছিল । হটাত গুল ক্ষেপে যেয়ে ঐ মেজরকে এরেস্ট করে রেখে দিয়েছিলো তাই সুবেদার থেকে ডিমোসন করে জমাদার হয়ে গেছে ; বহু পুরানা বন্ধু । সব সময় ছুটিতে গেলে আমার জন্য পেশওয়ার থেকে চপ্পল নিয়ে আসতো। ওকে সালাম দিলাম রানার গোলাম রসুলকে দিয়ে ; অনেকক্ষণ কথা বললাম - বুঝলাম ওরা সব কয়জনই শঙ্কিত এবং একটু ভীত । আমার সবচে বিশ্বস্ত হাভিলদার মেজর ফরহাদকে ডাকলাম - সিগারেট খেতে খেতে রান ওয়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে বেশ দুরে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম সব সংবাদ । ফরহাদ আমার সাথে খুলনা ৫ উইং, রামগড় এ কাসালং ফায়ারিং এ ছিল তার লাতুতে আমার কোম্পানির কোঁত নায়েক ছিল, ১৯৬৯ এ আমার এ সি আর এর রেকোমেন্ডএসন এ লাঠি টিলা যুদ্ধে ওর কৃতিত্ব সেক্টর কমান্ডার সিতার ই জুরাত লে  কর্নেল  আব্রার হাসন আব্বাসিকে রিকুয়েস্ট করে ওর প্রমোশনটা বেবস্থা করে ছিলাম । বাঙ্গালি হাভিলদার মেজর খুবই কম হত পাঞ্জাবিরা সব ভালো ভালো পোস্ট গুলো নিয়ে নিত । গেঁড়াইবাজী (স্বজনপ্রীতি) একটি অতীব পরিচিত শব্দ ফৌজে। ১৩ বছর এ ও এখনো ই পি আর এর পলিটিক্স বুঝে উঠতে পারি নাই। ফরাহদ বলল স্যার অবস্থা কিন্তু মোটেও ভালো না , পাঞ্জাবি, বালুচি, পাঠান গুলাকে কোন ভাবেই গার্ড পোস্টে বা বাইরে পাঠানো যাবে না। স্যার পাঞ্জাবিরা কিছু একটা করবেই করবে। ভীষণ হারামি এরা । আমাদের এই আন্দোলন কোন ভাবেই বরদাস্ত করবে না । জিজ্ঞেস করলাম ওয়ার লেস সেট কি সেট করা হয়ে গেছে ? বলল স্যার রাত ৯ টার ভিতর হয়ে যাবে । বললাম এরিয়া পেট্রল ছাড়া ও রুমে ১ তিন গার্ড লাগাতে - আমার ওয়াচ টাওয়ারে দুইটা হাতিয়ার আর আমার থ্রি এইট  রিভলভার এ ২৪ রাউন্ড গুলি সহ  বাতেনকে   দিতে আর গোলাম রসুলকে বিস্তারা লাগাতে বল । কোঁতের দরজায় চার পায়া দিয়ে ব্লক করে ওর বিছানা লাগাতে বললাম । মেন গেঁটে লেস নায়েক আরব আলী কে গার্ড কমান্ডার করবার জন্য । ও বলল স্যার সিপাইরা ওগো সাথে কথাও বলতে চায় না ।সম্পর্ক প্রায় ভঙ্গুর । সব জওয়ানরা ক্ষুব্ধ ও ঘৃণা করছে সবগুলোকে । বারবার ওকে সাবধান করে দিলাম যাতে কোন রকম অঘটন যেন না ঘটে । ফরহাদ কে বিদায় করে আরেক টা সিগারেট ধরালাম আর পায়চারি করতে করতে করতে ভাবলাম অনেকক্ষণ । ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সাত টা ১১ মিনিট বললাম বাজারে একটা দোকান ও খোলা নেই , অনেক গুলো কুকুর কাঁদছে করুন সুরে , দুরে  কোথাও ট্রেনের আওয়াজ শুনতে পেলাম ।  জুড়িতে মান্নান  কোম্পানি কমান্ডার,লাতুতে পাঞ্জাবি একজন  আর তামাবিলে বি আর চৌধুরী- সুনামগঞ্জে নসিবুর রহমান - টেলিয়াপাড়া তে ও নাকি পাঠান এক কম্যান্ডার  । বাকি কোম্পানি কমান্ডার সবাইই পাঞ্জাবি । আরও এক দুইজন বাঙ্গালি থাকলে থাকতেও পাড়ে কিন্তু ঐ মুহূর্তে আর কারো নাম মনে করতে পারছিলাম না । কেবল ঢাকা থেকে বদলি হয়ে আসলাম - ১৬ উইং ই পি আর রেইজ করে - সদ্য ঘোষণা হয়েছে আমাকে পি পি এম  ( পাকিস্তান পুলিস মেডেল ) নাকি দেওয়া হবে ।  সুবেদার মেজর রব আমাকে এর মধ্যে রাতের বেলা  গোপনে নিয়ে গিয়েছিল নেতার সাথে - কি বিশাল তার পারসোনালিটি    এবং কণ্ঠস্বর । বলল রেডি থেক - ওদের কে কোন প্রকারেই বিশ্বাস করা যাবে না । বুঝলাম রব সাহেবের সাথে ওনার নিত্য যোগাযোগ আছে । রব সাহেব সেন্ট্রাল সুবেদার মেজর ই পি আর এর বিশাল ক্ষমতাধারী সে । প্রথম দেখাই অপরিসীম আনুগত্য নিজের অজান্তেই সমর্পণ করেছিলাম অনার প্রতি । রব সাহেব বললেন খুব সাবধান থাকতে । আর কাউকে না জানাতে ঐ মিটিং এর ব্যাপারে ।  ওরা সবাই  বি, বাড়িয়া ওদের মায়ের গার্লস স্কুলে তে নতুন চাকরী, নতুন জায়গা, বাবুলের সামনে মেট্রিক পরীক্ষা, মুন্না অন্নদা স্কুলে  যাচ্ছে । এর মধ্যে এই সব বেশ ভাবনার ব্যাপার ।


   ১৯৪৬ পর্যন্ত কলকাতার স্কুলে থাকাকালীন সময়ে কি না দেখলাম পাকিস্তান পাকিস্তান চিল্লাচিল্লি আর আজ সব যেন কেমন তাসের ঘরের মত  টলটলায়মান । ২৮ দিনে এক কাপড়ে আব্বা, আম্মা, আর ছোট ওবায়েদ  সহ আধ পেটা খেয়ে না খেয়ে কলকাতা থেকে পূর্ব বাংলায় আসতে লেগেছিল । রাস্তায় হিন্দু কিবা মসুল্মান দুই পক্ষই সমান ভাবে নিগৃহীত করেছিল আমাদের  । হিন্দুদের কাছে আমারা ছিলাম বাঙ্গাল আর মসুলমান দের কাছে ছিলাম '' ঐ দেখো কলিকাতার লাট সাহেবরা আসছে ।'' অনেক চড়াই উতরাই পাড় হয়ে নতুন  ভাবে জীবন শুরু করলাম বাবা কপর্দকহীন হয়ে গেলো,তার সেই স্যুট টাই পড়া গ্র্যান্ড হোটেলের চাকরী হারিয়ে সে দিন দিন  কেমন যেন প্রাণহীন হয়ে পরল । ১৯১১ সালে সে সিলচর স্কুল থেকে বের হয়ে বিদেশ বিভূঁইতেই  তার নিবাস - ১৯১৮ থেকে ১৯২৩ পর্যন্ত জার্মানি ও বিলাত তে থেকে তারাপর ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কলাকাতাই ছিল তার বাড়ি ঘর সংসার, বন্ধু, বান্ধব, তাস খেলা , রেস কোর্সে  ঘোড়ার রেস এবং দু এক টা ঘোড়ায় বাজী ধরাও ছিল তার  অভ্যাস । সেই সব ফেলে অজ পাড়া গাঁয়ে আব্বা নিজেকে আর আগের মত খুঁজে পেত না ।সব সময় বিষণ্ণ । অভাব সংসারে উপায় না পেয়ে পুলিস এ জয়েন করতে বাধ্য হলাম । এক সময়কার নাম কড়া ছাত্র, মেধাবী বলে পরিচিত খোকা আজ কোথায় আর তারই প্রিয় বন্ধু, কলেজ হোস্টেলের রুম মেট ফৌজদার ক্যাডেট কলেজের ফিজিক্স এর প্রভাষক। খুবই প্রিয় বন্ধু ছিল ওরা। ১৯৪৯ বি, বাড়িয়া কলেজের প্রথম ব্যাচ - এলাকার সবার প্রিয় খোকা ভাই । পান্না চাঁচার বুদ্ধিতে সকলকে  না জানিয়েই জয়েন করে ফেলেছিলাম  পুলিশে - অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে - নাম সর্বস্ব একটা চাকরী , কাজ কড়া লাগে সব লিটারেট কনস্টেবলের মত । কোন দাম নাই কেবল  একটা আশা যে  ডিপারট্মেন্টাল প্রমোশন পেয়ে পেয়ে এক দিন এসডিপিও পর্যন্ত ও হয়ত পৌঁছেতে পারবো হয়ত বা । কেমন যেন কি আশায় বাঁধি খেলাঘর বেদনার বালুচরে। হটাত পুড়তে থাকা সিগারেট এর শেষ অংশ দুই আঙ্গুলের ফাঁকে আগুনে ঝলসে যাবার প্রাক্বালে প্রকিতস্থ হলাম । ফিরে আসলাম বাস্তবে ।


 আজ আবার ভাগ্যাকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা কেমন যেন একটা থমথমে ভাব । এয়ার পোর্ট এর সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্লেভ লেবার হিশেবে এলাকার জনগণ দেড় দিয়ে বিমানবন্দর বানানো মেন বিল্ডিং টাই ক্যাম্প - শেষ প্রান্তে সিঁড়ি ঘর আর ওর উপড়েই  ওয়াচ টাওয়ার দুইটা গোলাকৃতি রুম - একটা বাথরুম ও আছে - এক রুমে আমি আর অন্য রুমে ওয়ারলেস সেট অপারেটর  মোস্তাফা আর বাতেন দেড় সবার জায়গা । সোজা উপড় এ উঠে এসে মোস্তাফা কে জিজ্ঞেস করলাম কত দেরী ? বলল স্যার ২০ মিনিটেই ও কে হবে সব । বললাম আমাকে মান্নান সাব অথবা বি আর চৌধুরী সাহেব কে পারলে মিলায়ে দিতে। এখানে প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো পাকিস্তান আমলে একমাত্র  ই পি আর এর কাছেই সারা দেশ ( পূর্ব পাকিস্তান বাপী) ওয়াইরলেস এ একে ওপরের সাথে যোগাযোগ করা যেত -  সব ই পি  আর ক্যাম্পে (বি ও পি - বর্ডার আউট পোস্ট )   টর এ টাঁককা টেলিগ্রাম ছিল যা দিয়ে সারা দেশের যে কোন ক্যাম্পে যোগাযোগ কড়া যেত। পোশাক আর খুল্লাম না , নিচে নেমে এসে বললাম রোল কল ডাকো ফল ইন কর সবাই কে । সেন্ট্রি ছাড়া  সবাই একত্রিত হল একটা ছোট বক্তৃতা দিলাম আর বললাম আমারা সরকারী চাকরীজীবী । সকালে পেট্রল এ গেলে কোন পাবলিক এর সাথে যেন কোন প্রকার দুর্ব্যবহার না কড়া হয়। সিপাই আবু বকর আর সিপাই দারু মিয়া দুইজনাই সিলেটী বললাম তোমরা দুইজন সকালে মুফতি ড্রেস ( সিভিল ড্রেস) লাগায়ে আমার সাথে দেখা করো । রোল কল ডিসমিস করতে না করতেই মোস্তফা এসে বলল স্যার  সেট  রেডি , মান্নান সাহেব প্রস্থুত কথা বলতে । উঠে গেলাম সিঁড়ি বেয়ে সেটের কামড়ায় । মান্নান ভাই এর সাথে অনেক কোড ল্যাঙ্গুয়েজে বাংলা , কুমিল্লা, ঢাকাইয়া এবং কুট্টি ভাষায় কথা বললাম - সেও খুবই আতঙ্কিত - কি হবে , কি করবো। সে আমাকে ক্লিয়ারলি বলল চৌধুরী খবরদার -  টু আই সি কাপ্টেন গোলাম রসুলের তোমার কোম্পানিকে ভিজিট করতে আসাটা খুবই রহস্যময় । কেয়ারফুল ।আমি ওকে বললাম আমি সিগনাল সেটের পাশেই থাকবো - কোন রকম খবর পেলেই যেন আমাকে জানায় । কথা বলতে বলতেই দুরে কুকুরের কান্না শুনতে পেলাম - নিদারুণ করুন সুরে অনেক গুলো কুকুর কাঁদছে দুরে সেই মনে হলো ট্রেন স্টেশন আর কাছে । হাভিলদার  মেজর ফরহাদকে ডেকে বললাম তিন সিপাই আর এক জন এন ছি ও হাতিয়ার সহ তৈরি করতে দশ মিনিটের মধ্যে । চতুর্দিকে কেমন যেন থমথমে একটা পরিস্থিতি মনে হল ; বাজার এর প্রহরী কয়েকটা উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো ; কেন জানি সেই ১৯৪৬ সালের কলকাতার থম থমে দাঙ্গা  এর  দিন গুলোর কথা মনে পড়েতে লাগল, একবার বাচ্চাদের চেহারা গুলো ভেসে উঠল মনের পর্দায় । বসে বসে  ডাবলু ডি ও হেইছ ডি উইলিস এন্ড ব্রিসটল এর  প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে আগুনটা জ্বালিয়ে বাইরে ওয়াচ টাওয়ারের টারেট এর ক্যানটিলিভার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা পান করতে লাগলাম । অনেক দুরে দেখতে পেলাম চা বাগানের আলোকিত প্রজ্বলিত বাংলোগুলো আর ফ্যাক্টরির চিমনি গুলো ; নিয়ন লাইটের আলোতে অন্ধকার সেই পারিপার্শ্বিকতার মাঝে মনে হল -  যেন গভীর রাতে হুগলী নদীর মাঝে কোন ইংরেজ কোম্পানির প্রমোদ তরি ভেসে বেড়াচ্ছে আলো বিচ্ছুরিত করতে করতে ; অপূর্ব  সেই দৃশ্য। অনেক দুরে রাতের আঁধারের মাঝে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল খাসি পাহাড়এর ছায়াগুলো  । ভাবলাম সকালে একবার মণিপুরি বস্তিতে যাবো ; চাতলাপুর এবং আসে পাশের এই সব এলাকা আমার খুবই পরিচিত ; সেই কয়েক বছর আগে আমি এই এলাকায়  ই পি আর এর কোম্পানি কমান্ডার ছিলাম শায়েস্তাগঞ্জ থেকে কুলাউরা পর্যন্ত - কমলগঞ্জ - মনু - ভানুগাছ এলাকার সব মণিপুরি বস্তির ব্রাহ্মণ আর মন্ত্রী গুলো সবাই আমার অতি পরিচিত । ভাবলাম কালকে সময় পেলে পিক আপটা নিয়ে এক চক্কর ঘুরে আসবো আর প্রিতিম্পাশার নবাব সাহেবকে ও হ্যালো বলে আসব - অনেক গল্প করতে পছন্দ করেন - লাঠি টিলা যুদ্ধের সময় অনেক হেল্প করেছিল ; এই এলাকার ইতিহাস সম্পর্কেও অনেক কিছু জেনেছি নবাব সাহেবের কাছ থেকে । আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে কখন যে হাতের সিগারেটটা শেষ হয়ে গেছে জানতেই পারলাম না - হটাত ফরহাদ ডাকল স্যার আসবো - শুনেই বাস্তবতায় ফিরে এলাম । ও বলল স্যার , আপনার কথা মত ১ তিন পেট্রল পার্টি রেডি । শুনেই নিচে শিরি বেয়ে নেমে আসলাম - সামনে দাঁড়ান ওরা চারজন -আস্তে করে ডেকে কাছে এনে বললাম তোমরা চার জন বাজারের ক্যামোফ্লাজ অবস্থায় টহল দিবে ফাস্ট লাইট পর্যন্ত । কোন রকম সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সোজা ক্যাম্পে ২  জন কে পাঠিয়ে দিবা ১  মাইলে বেশি দুরে যাবা না । ওরা সোজা গেটের সেনট্রিদের বলেই  সবার ঘুম ভাঙ্গিয়ে টাওয়ারে পজিশন নিবে - বাকি দুজন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবসারভ করে তারপর এয়ারপোর্ট এর অন্য পাশ দিয়ে প্রবেশ করবে - পাসওয়ার্ড আবার মনে করিয়ে দিয়ে  বললাম এসেই যেন আমার কাছে রিপোর্ট করে - ওদের বিদায় করলাম -  নায়েক   বাছিত মিয়া  আমার  ফাইভ উইং  এর  পরিচিত  - বললাম  বাছিত  খুব সাবধান ।  পরিস্থিতি সন্দেহ জনক  । ঐ  পাকিস্তানি  উর্দু ওয়ালাদেরকে  কেন  জানি  আর  বিশ্বাস  করতে  পারছি না  ।  মনটা  কেমন যেন  বিষিয়ে  গেছে ওদের উপর  ।  ইতিমধ্যে  ২৫ সে মার্চ   ঘড়িতে সকাল তখন  প্রায়  ২  টা পাঁচ বাজে ।''


একটা জিনিশ মানতেই হবে বাঙ্গালীন সৈনিকরা অত্যন্ত সংবেদশীল এবং রিসোর্সফুল শমশেরনগর আসার পঢ় থেকে এরই মধ্যে ক্যাম্প সেট আপ করে ফেলেছে চোখের পলকে ; একমাত্র চৌকিটা কম্যান্ডারএর জন্য বাকি সবাই ফ্লোরেই বিছানা পেতে ফেলেছে । 


উনিফরম খুলে কন্ট্রোল টাওয়ারএর সংলগ্ন বাথরুমে সব ব্যাবস্থা করা । বিছানায় শুয়ে শুয়ে ডাইরিটা লেখলাম এবং সকালের টাস্কগুলো লেখে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম ; সারারাত কোন ঘুম  আসলো না , অনেক বার ওলোট পালট করে গুমিয়ে পরলাম । সকালে ঘুম ভাঙল ওয়ারলেস অপারেটর এর ডাকে - বলল স্যার সুনামগঞ্জের কোম্পানি কমান্ডার নসিব আলি সাহেব কথা বলতে চায় । তড়িঘড়ি উঠেই সেটের কাছে গেলাম - উনি বলল উইং হেড কোয়াটার এ কোন বাঙ্গালী অপারেটর নেই সব পাঞ্জাবি । সেক্টর এও কাউকে সেটে পাওয়া গেলো না । ঢাকা পিলখানাতেও  কোন প্রকার যোগাযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না । উইং হেড কোয়াটার এর অপারেটর বলল দৈনন্দিন সিট্রেপ ( সিচুয়েসন রিপোর্ট ) পাঠাতে । আমাকে জিজ্ঞেস করলো কখন এসেছি শমশেরনগরএ । বলল উনি নাকি বি বি সি রেডিও তে শুনেছে ঢাকায় সারা রাত গুলাগুলি হয়েছে বেশি কিছুই আর বলতে পারল না । সেট অন্য রাখতে বলল সারক্ষন । ওনার উইং এর আর একমাত্র কোম্পানি কম্মাডার বি, আর চৌধুরী ওনার সাথে যোগাযোগ করবেন । আমি জানালাম রাত্রে জুরির কোম্পানি কম্মাডার এর সাথে কথা হয়েছে । নসিব বলল পরিস্থিথি ঘোলাটে । উনি তার দুই প্লাটুন কে অলরেডি কোম্পানি হেইচ  কিউ তে চলে আস্তে বলেছে - উনিই বলল তেলিয়াপারা এবং লাতুর কোম্পানি কম্যান্ডার দুই জনই পাঞ্জাবি এবং খতরন্যাক । বললেন আবার ১২ টায় কথা হবে - আমি বললাম নতুন ফ্রিকুয়েঞ্ছি লিখে নিতে - বলেই একটা নতুন ফ্রিকুয়েঞ্ছি  - তারপরই অপারেটর কে বললাম তামাবিল এবং জুড়ি কে কল করার জন্য - কল করে ওদেরকেও বাংলায় এই নতুন ফ্রিকুয়েঞ্ছি  দিয়ে বললাম এই ফ্রিকুয়েঞ্ছি  ১২ টার সময় যেন কোম্পানি কম্মাডাররা লাইনে আসে । 


এরিয়া পেট্রল এর কম্যান্ডার সব রিপোর্ট দিল এবং বলল আর্মি কোম্পানির কোন প্রকার মুভমেন্ট নাই । হাভিলডার মেজর কে আদেশ দিলাম এক পাচ এরিয়া পেট্রল রেডি করতে সকাল দশটায় ওরা পেট্রল চেঞ্জ করবে - তার আগে আমার ব্রিফিং নিয়ে যাবে । তরঘরি করে প্রাত্যহিক কাজ শেষ উনিফরম পরে ব্রেকফাস্ট শেষ করে নিচে নেমেই প্রথমেই খোজ নিলাম কোয়াটার গার্ডএ বন্দিদের । ফরহাদ বলল স্যার আপনার জন্য একটা অফিস এর ব্যবস্থা করেছি বলেই আমাকে নিয়ে গেলো একটা ছোট্ট রুমে টেবিল এবং চেয়ার সহ একটা রুম ছিল ওই অফিসে । সব সৈনিক রেডি ফুল এফ এস এমো (ফিল্ড সার্ভিস মারচিং অর্ডার - ঝোলা - পিট্টূ ) পরিধান করা এবং হাতিয়ার নিয়ে সব বসে আছে । ফরহাদ কানে কানে বলল স্যার ঐ বন্দিদের হাত পা' বেধে চোখ বেধে ফেলাই ঠিক হবে ।  কোন উত্তর দিলাম না - শুধু চোখ রাঙ্গিয়ে তাকালাম ওর দিকে । ফরহাদ সহ আমার অতি পরিচিত  ব্রাভো কোম্পানির সব সৈনিক গুলোই কেমন জানি দুর্ধর্ষ প্রকৃতির হয়ে যাচ্ছে ক্রমানয়ে । একটু বিচলিত হলাম ওদের এগ্রেশিভ মনোভাব দেখে । একবার ভাবলাম ওয়্যারলেস সেট নিছে অফিসে নিয়ে আসব কিনা - তারপরই চিন্তা করলাম সব কথা ঐ বন্দিরা শুনে ফেলবে । 


চা খাওয়ার সময় এক দল লোক মিছিল নিয়ে আমাদের ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে আসল - আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইল - আমি গেঁটের সামনে যেয়ে কথা বললাম - ওরা বলল ঢাকা তে গোলাগুলি এবং ট্যাঙ্ক দিয়ে সারারাত গোলাগুলি হেয়েছে । আওয়ামী লীগ এবং ছাত্র লীগ, অন্যান্য সব দল এবং ছাত্র - আনসার - মুজাহিদ সবার হাতেই লাঠি - তীর ধনুক - বন্দুক , এয়ারগান - বল্লম , রামদা - চা বাগানের কুলিদের ব্যবহৃত বিশাল আকৃতির প্রফেশনাল তীর এবং টিন এর ধনুক । মুজাহিদ এবং আনসাররা ইউনিফর্ম পরে  রেডি । মুজাহিদ কমান্ডারকে কথা বললাম এবং ওকে আমাদের কাছেই আমাদের ক্যাম্পে থাকতে বললাম । 


অবস্থ্যা খুবি কেন জানি শঙ্কাজনক মনে হতে লাগলো । মিছিলের নেতা দের সাথে কথা বলে বুঝলাম বাঙ্গালী ধৈর্য এসে পরেছে শেষ পর্যায়ে । সংঘর্ষ ছাড়া উপায় নাই । হাভিলদার মেজরকে বললাম দুই টা পেট্রোল রেডি করতে । দশ জন প্লাস দুই নায়েক দিয়ে পেট্রল পাঠিয়ে দিলাম এবং কোন দুইজন খবর নিয়ে আসবে ওদের ব্রিফিং দিতে দিতে অপারেটর বলল ও আকাশবাণী রেডিও তে শুনেছে ঢাকায় গোলাগুলিঢ় কথা - বি বি সি এর কাছ থেকে পাওয়া সংবাদ । 


ইতোমধ্যে বেলা বারোটা বেজে যাচ্ছে - উপরে যেয়ে ওয়্যারলেস সেটের সামনে অপেক্ষা করতে লাগলাম - অপারেটর অনেক চ্যানেল ঘুরাচ্ছে খুবি ব্যাতিব্যস্ত হয়ে । চারজন কথা বললাম - ব্রাহ্মণবাড়িয়া - চাঁদপুর - চাটগাইয়া এবং শুদ্ধ বাংলা মিলিয়ে আমি, মান্নান ভাই - নসিবুর রহমান এবং বি, আর চৌধুরী মিলে - ওনারা কনফার্ম করলো ঢাকা পিলখানা - রাজারবাগ - ইউনিভার্সিটিতে গণহত্যা এবং ঢাকা শহরে কাল সারারাত ধরে কামান আর ট্যাঙ্কের গোলাগুলির আওয়াজ চলেছে - চতুর্দিকে হাহাকার , ই পি আর জওয়ানরা পাল্লাছে, পুলিস রা যে যেমনে পারে সেই দিকেই পাল্লাছে । ঢাকায় ক্যারফিউ চলছে । রাস্তা ঘাটে মানুষের লাশ যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে । সবাই আমরা সিধান্ত নিলাম যে যা থাকে কপালে এর প্রতিবাদ আমরা অস্ত্র দিয়েই দিব । বি, আর চৌধুরীর আওয়াজেই বুঝলাম সে যে কি পরিমাণ রাগান্বিত - পুরানো ই পি আর এর লোক  বি, আর চৌধুরী পরাক্রমশালী সাহসী - আমরা ১৯৬২ সালে এক সাথে কাসালং এর যুদ্ধে কোম্পানি কম্যান্ডার ছিলাম ; নসিবুর রহমান বলল সিলেট ক্যাপচার করতে হবে । মান্নান ভাই নীরব কারন ওর ফ্যামিলি ঢাকার জিগাতলা এলাকায় ছোট্ট ছোট্ট দুইটা বাচ্চা ভাবী একা । অনেক অনেক বড় দীর্ঘ শ্বাস ফেলল ; আর বলল তোমরা যা করবা আমিও আছি - আমাকের বলল ফজলু আমার মনে হয় আমাদের দুই কোম্পানি একত্রিত হয়ে সিলেট অভিমুখে গেলেই ভালো হবে ; বি আর তামাবিল থেকে সিলেট আসতে তার বেশি বেগ পেতে হবে না । আমি বললাম যে, ক্যাপটেন গোলাম রসুল আসার কথা আমার সাথে দেখা করতে - সবাই এক বাক্যে বলল, পালাও ! কথা শেষ করার আগে নতুন ফ্রিকুয়েঞ্ছি বিনিময় করে সবাই বিদায় নিলাম । 


ড্রাইভারকে বললাম পিক আপ রেডি করতে এক এন সি ও আর তিন জওয়ান নিয়ে বের হয়ে পরলাম প্রথমে শহর টা প্রদক্ষিণ করলাম আমার এরিয়া পেট্রল দের সাথে কথা বললাম - ওদের কে আবার মনে করিয়ে দিলাম টু আই সি আসার কথা ; রেল স্টেশন এর দিকেও খেয়াল রাখতে বললাম - ওরা বলল সব রাস্তা এবং রেল লাইনে ব্যারিকেড দেওয়া হয়ে গেছে । গাড়ী বা ট্রেন আসতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে এই সব ব্যারিকেড সরাতে । 


বাজারের পরেই শমশেরনগর ডাক বাংলো - ওখানে যেয়ে ওখানকার কম্যান্ডার মেজর খালেদ মোশাররাফ সাহেবের সাথে দেখা করলাম - খুবি আপ্যায়ন করলেন এবং অনেক ক্ষণ কথা বললেন আমি ওনাকে বললাম আমাদের চার ইপিআর কোম্পানি কমান্ডারদের উদ্দেশ্য এবং ওনার নিকট থেকে দিক নির্দেশনা চাইলাম । স্যার আমাকে বললেন চৌধুরী সাব আমি আপনাকে এই ক্রান্তি কালে আপনাকে  কোন রকম আদেশ বা উপদেশ দেবার মত কোন এখতিয়ার আমার নাই । উনিও বললেন ঢাকার কথা । তারপর ওনার কোম্পানির অন্যান্য জে, সি, ও দের সাথে কিছুটা সময় ব্যয় করে বিদায় নিলাম । একবার ভাবলাম জুরী তে চলে যাই এক চক্কর মান্নান ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করে আসি - জুরী অনেক দুর রাস্তায় আনার ব্যারিকেড থাকলে না ও পৌছতে পারি সময়মত ।প্রায় ৫০ মাইল আসা যাওয়া ।


পথিমধ্যে আসার পথে দেখি চার পাচ জন আনসার এবং মুজাহিদ এর ড্রেস পরা লোক দাঁড়িয়ে আছে - ওদের সাথে কথা বলে গাড়ীতে উঠতে বললাম - ওখান থেকে সোজা চলে গেলাম নবাব সাহেবের বাড়িতে - উনি আসলেন দহলিজে অনেকক্ষণ কথা বললাম - উনি বললেন ওনার পূর্বপুরুষদের নবাব কিভাবে ১৮৫৭  সালে সিপাহি বিপ্লবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহীদের পক্ষ নিয়েছিল । ১৮২৫ সালে যখন ইংরেজ বাহিনী সিলেট দখল করতে আসে তখনও ওনার বংশের পূর্ববর্তী নবাব তার বাহিনী নিয়ে অন্যান্য রাজা এবং নবাবও জমিদার বাহিনীর  বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং লাটু তে এক বিশাল যুদ্ধ হয়েছিল এবং আমাকে মনে করিয়ো দিল আমার পুরানো কম্পানির কথা ( লাঠীটিলা যুদ্ধের কথা ) । অনেক বিজ্ঞ মানুষ কিন্তু ওনার পাকিস্তান আইডিয়োলজি এখনও বেশ প্রকট - ঢাকার ক্র্যাকডাউন কেমন জানি বিশ্বাস করতে চাইলেন না । তারপরও উনি বললেন আমরা যদি বাঙ্গালী জাতীয়তাকে সমুন্নত রাখতে ঝাঁপিয়ে পরি তাহলে উনি থাকবেন আমাদের সাথে । আমি কেন জানি ওনাকে সব সময়ই খুবি একজন বিশস্থ এবং পরোপোকারি হিসাবেই দেখেছি সেই লাঠি টিলা স্ক্রিমিশ এর সময় থেকে । 


একের পর সিগারেট টানতেই থাকলাম সারা দিন, মুজাহিদ এর কম্যান্ডার এর সাথে এলাকা সম্পর্কে অনেক কথা জানলাম । ভানুগাছ এর দিকে দ্রুত গাড়ী দিয়ে যেয়ে মনিপুরী বস্তিতেও একটা ঢুঁ মারলাম এবং ঐ দিকটাও একটু রেকি করে আসলাম । বস্তির মন্ত্রী জাতীয় এক জন এর সাথে কথা বলে শমশেরনগর ফিরে আসলাম । 


ফেরার পথে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি আরম্ভ হল - রাস্তা একবারে পিচ্ছিল হয়ে গেল বেশ আস্তে আস্তে করেই ক্যাম্পে ফিরলাম । একজন নেতা সাথে আরও কয়েকজনকে নিয়ে মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আছে - ওনাদের সাথে কথা বললাম ততক্ষণে ঢাকার খবর অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে - গাঁয়ের রোম শিউরে উঠলো । ওরাই জানালো থার্টি ওয়ান পাঞ্জাব রেজিমেন্ট মৌলভীবাজার এবং শ্রীমঙ্গল এ ক্যাম্প করেছে - সকাল থেকে শহরে পেট্রোল চালিয়ে যাচ্ছে । ই পি আর এর ও পেট্রল দিচ্ছে - চিন্তা করলাম মৌলভীবাজার এবং শ্রীমঙ্গলতে কোন ই পি আর নাই তাহলে এরা  কোথাকার ? ২৬ সে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাত টা বাজে তখন ! সঙ্গে সঙ্গে ভাবলাম থ্রি উইং ই পি আর এর উপ অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল ছাড়া অন্য কেউ হতেই পারে না  মৌলভীবাজার এবং শ্রীমঙ্গলে ! 


মনে মনে সঙ্গে সঙ্গে সিধান্ত নিয়ে ফেললাম আর অপেক্ষা করা যাবে না - একেবারে দিব্য লোকের মত স্পষ্ট যে ওরা আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে এবং চতুরদিকে হাহাহার । আত্মসম্মান এ প্রচণ্ড আঘাত লাগতে শুরু করল । যা বলা তাই কাজ - কোম্পানির কাছে মাত্র একটা বাইনোকুলার - হাভিলদার মেজরকে ডেকে বললাম সকাল এ পুরা স্যান্ডটু - তিনজন কন্ট্রোল টাওয়ারে উঠে সব অবসারভ করবে ৩৬০ ডিগ্রি । কোন প্রকার কনভয় আসতে দেখামাত্র অ্যালার্ম বাজিয়ে দিবে । নিচে অ্যামবুশ এর জন্য সবাই কে  ব্রিফিং দেবার জন্য ডাকলাম এবং এম্বুশ প্লান করে ফেললাম সঙ্গে সঙ্গে । বাজার থেকে যে রাস্তা এয়ার পোর্টের দিকে ঐ রাস্তায় এম্বুশ  পাতার অর্ডার দিয়ে দিলাম তৎক্ষণাৎ । শমশেরনগর পূর্ব বাজার - ভানুগাছ রোড এবং নমৌজা রোডের ট্রাই জংশনে এম্বুশ পাতার জায়গা নির্ধারণ করলাম । 


সকাল ছয়টায় এম্বুশ এ স্থান গ্রহণ করলো সব পার্টি গুলো এরিয়া পেট্রল গ্রুপ রেল স্টেশন থেকে খবর দিবে - আরেক এরিয়া পেট্রল বাজার এর ভিতর পেট্রল করবে । ক্যাম্প ইন চার্জ হাভিলদার মেজর এবং বাতেন । গার্ড কমান্ডার কয়েদিদের গার্ডে থাকল বাকি সবাই এম্বুশ পজিশনে । ওয়্যারলেস অপারেটর এবং ওপি পোস্টে তিনজন । তিন জন এর মধ্যে একজন রানার খবর দেবার জন্য । মুজাহিদ এবং আনসার দের কেও বন্দি পাঞ্জাবিদের অস্ত্র একটু বুঝিয়ে দিয়ে ওদের কে এম্বুশ এ সামিল করলাম । 






সকাল নয়টার কয়েক মিনিট পরেই ওপি পোস্ট খবর পাঠাল তিনটা গাড়ী আসছে আলিপুর টি এস্টেটের থেকে দূরে  ওখানে দেখা যাচ্ছে - রাস্তায় ধুলা উড়াতে উড়াতে আসছে - একটা জীপ এবং দুইটা লরি ট্রাক শমশেরনগর কমলগঞ্জ রোড ধরে । গোলাম রসুল এক গ্রুপ এর সেকশন কম্যান্ডার । আমার সাথে ৬ জন । অপেক্ষা শুধু অপেক্ষা । 


প্রায় এক মাইল বিস্তৃত এম্বুশ - এবং  ও পি দের  দেখার খবর পাওয়াতে এম্বুশ আরও সুদৃঢ় ভাবে এডজাস্ট করে নিলাম । বাজারে ডাক বাংলোর পরে কয়েকটা পানের টং দিয়ে রাস্তা ব্লক করে দিলাম - ইতিমধ্যে এরিয়া পেট্রল জানিয়ে ছিল যে ফার্স্ট লাইটের সময় আর্মি ডাক বাংলো থেকে চলে গেছে - মেজর খালেদ মোশাররাফ সাহেবের চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল । 


এম্বুশএ গাড়ী গুলো  প্রবেশ করার সাথে সাথেই গর্জে উঠলো ফজলুল হক চৌধুরী কোম্পানির আক্রমণ ; চোখের পলকে ধূলিসাৎ করে দিল তিন তিন টি গাড়ী গুলোকে কয়েক মিনিটের মধ্যেই । শুরু হলো সমগ্র অবিভক্ত সিলেট ( ১৯৭১ ) জেলার প্রথম বিদ্রোহ ফজলুল হক চৌধুরী'র আদেশে এবং নেতৃত্বে ।





ঐ এম্বুশে ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল সহ ৩১ জন নিহত হয় ।  মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টর কম্যান্ডার  মেজর জেনারেল সি আর দত্ত - তপন কুমার দেএরপর মৌলোভীবাজার আক্রমণ - সিলেট আক্রমন এ সি আর দত্তের বাহিনীর দুই কোম্পানির অন্যতম কোম্পানি কমান্ডার , অন্য কোম্পানী কম্মাডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান ( বীর উত্তম ) ( মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান বীর উত্তম - দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট  )  হয়ে সিলেট দখল করা । ঐ যুদ্ধে তদানীন্তন ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান আহত হয়েছিলেন । শমসেরনগর এর প্রথম যুদ্ধ এবং বিদ্রোহ শুরু করার পর সময় ছিলনা আর পিছনে ফিরে তাকানোর । শমশেরনগর সঙ্গে সঙ্গে ত্যাগ করে নতুন ক্যাম্প বানালো চাতলপুর এ ওইখানে বন্দীগুলো সহ হাভিলদার মেজর ফরহাদকে চার্জে দিয়ে ক্যাপচার করে দুটো গাড়ী সহ চলে গেল মৌলভিবাজার অভিমুখে -  মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ইতিহাসের বইয়ে বর্ণিত সেই মৌলভিবাজারএ  অবস্থিত থার্টি ওয়ান পাঞ্জাবের ঐ দুই কোম্পানিকে হামলা করেন আব্বা তার সৈন্যবল নিয়ে - এর পর দেখা হয় কমান্ডান্ট মানিক চৌধুরীর সাথে ; মানিক  চৌধুরী আব্বার পূর্ব পরিচিত, উনি বললেন চলেন ক্যাপ্টেন সি আর দত্তের সাথে দেখা করি ; ঐ দিন থেকেই তারা একসাথে সম্পূর্ণ নয় মাস ছিলেন । সি আর দত্তের নেতৃত্বে সিলেট যুদ্ধের  পর  ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া আবার আব্বা মিলিত হন তার কোম্পানির সঙ্গে পুনরায় চাতলাপুরে ।   ২৩সে মার্চ এর ৯১ জন জনবলের সংখ্যা দাড়ায় মাত্র ৪৭ জনে মাত্র ১৯ সে এপ্রিলে । ৮ ই এপ্রিল সিলেট  যুদ্ধের পর সম্পূর্ণভাবে আব্বার কোম্পানি ছত্রভঙ্গ হয়ে  পরে, সিলেট থেকে বিশ্বনাথ - জগন্নাথপুর - নারায়ণপুর - পাঁচগাও - কুলাউরা ( কুলাউরাতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে ) হয়ে ১৯সে এপ্রিল চাতলাপুরে মিলত হন তার কোম্পানির সাথে । 

  এবং তারপর শমশেরনগর থেকে ন' মৌজা থেকে চাতলাপুর বি ও পি থেকে কৈলাসশহর এ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন করেন কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী সাথে সংবদ্ধভাবে - প্রশিক্ষণ - কৈলাসশহর ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার পোর্ট হুমকি থেকে মুক্ত রাখার জন্য  ন'মৌজা / চাতলাপুর কে শত্রু মুক্ত রাখে সম্পূর্ণ যুদ্ধকালীন সময়ে এবং গেরিলা যুদ্ধ  চালিয়ে যান ।  চাতলাপুর থেকে কৈলাশশহরে প্রবেশ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যান সেখান থেকেই । 



১৯৭১  জুলাই মাসে  আহত হয়ে কৈলসশহর এবং লাখনো হাসপাতালে চিকিৎসার পর সাব সেক্টর কম্যান্ডার দায়িত্ব হস্তান্তর করে মেজর জেনারেল সি আর দত্তের  নেতৃত্বে  চার সেক্টর এর অন্যতম প্রধান কোম্পানি কম্যান্ডার হিসেবে ভারতীয় বাহিনীর এইট মাউন্টেন ডিভিশন এর ফিফটি নাইন মাউন্টেন ব্রিগেড এর  ৪/৫ গোর্খা রেজিমেন্ট এর সাথে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে - গোর্খা রেজিমেন্ট  এর খুকরি যুদ্ধের সহযোদ্ধা এবং কারিমগঞ্জ - জকিগঞ্জ - আটগ্রাম - চুরখাই হয়ে সিলেট - হরিপুর - খাদিমনগর -  সিলেট বিমানঘাটি - পাকিস্তান আর্মির রেসিডেণ্টসিয়াল স্কুলে অবিস্থিত দুই শত দুই বিগ্রেড - ৩১৩ ব্রিগেড - এবং থার্টি ওয়ান পাঞ্জাব কে পরাজিত করে সিলেট দখল করার এক অন্যতম সেনানী ।মেঃ জেঃ সি আর দত্ত তার বইতে সিলেট আক্রমণ এর বিশদ বর্ণনায় বলেছেন চার নম্বর সেক্টর যে বাহিনী নিয়ে উনি সিলেট অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিলেন সে বাহিনীর দুটো কোম্পানির কম্যান্ডারদের একজন ছিলেন ক্যাপ্টেন রব ( সাপ্লাই কোর এর - প্রবর্তিতে মেজর জেনারেল ) আর অন্য কোম্পানি কম্মাডার ছিলেন আমাদের পিতা ফজলুল হক চৌধুরী । আসলে ঐ কোম্পানি গুলো কোম্পানি নয় ঐ গুলো ছিল একেকটা ব্যাটালিয়ন এর সমান যেমন আব্বার কোম্পানিতে ছিল ৬০০ এর অধিক মুক্তিযোদ্ধা । আব্বার কোম্পানি ছিল সম্পূর্ণ অপারেশনে  সি আর দত্ত এর সাথে সাথে অতন্দ্র প্রহরীর মত ।


 তার ডাইরীতে সংকলিত - তার নিজের লেখায় বর্ণিত ছিল উনি সর্বমোট ১৩৫  টা অপারেশন (যুদ্ধে ) এ নেতৃত্ব দান করেছেন এবং / অথবা অংশগ্রহণ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে । প্রতি দুই( এক দসমিক 5  দিনে ) । মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সকল সময় বলতেন হরিপুর ( সিলেট ) এর যুদ্ধে ৪/৫ গুর্খা যদি তার কোম্পানির সাহায্যে না আসতো তাহলে হয়ত আমরা পিতৃশূন্য হতাম সেই ১৩/১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে - যেই যুদ্ধে হাভিলদার গোলাম রসুল শহীদ হন । জেনারেল সি আর দত্ত তার বইতে লিখেছেন, তিনি  গোলাম রসুল জন্য  পদক দেবার আমার পিতার লিখিত রিকেম্যানডেসন  কে বীর শ্রেষ্ঠ প্রদান করার জন্য সাইটেসন প্রেরণ করেছিলেন - যদিও তাকে সরকার বীর বিক্রম প্রদান করে । গোলাম রসুল আমার পিতার কোম্পানির সৈনিক এবং সে নিহত হয়েছিল আমার পিতার দুই গজ সামনে - সেই রাত্রে  ৪/৫ গুর্খা সৈন্যরা দেখেছিল তাদের সাহসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । 


সিলেট জয় করার পর আব্বাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ফোর সেক্টর বি, ডি, এফ ( বাংলাদেশ ফোরসেস ) এর সুবেদার মেজর প্রথম এবং শেষ সুবেদার মেজর হিসাবে ।সি আর দত্ত আব্বাকে জিজ্ঞেস করেন কোথায় হেড কোয়াটার বানানো যায় ? আব্বা তখন বলেছিলেন ই পি আর এর প্রাক্তন ক্যাম্প ই ভাল হবে , সেক্টর কম্যান্ডার বললেন, ফজলু তুমি সিলেট আমার থেকে বেশি ভাল চিনো, তুমিই জায়গা বের করো ।  সঙ্গে সঙ্গে উনি যেই ব্লু বার্ড স্কুল /জামিয়া স্কুল এ অবস্থিত থ্রি উইং ই পি আর হেড কোয়াটার থেকে মুক্তি যুদ্ধের উদ্দেশ্যে ২৩ মার্চ রওনা করেছিল ঠিক ৮ মাস ২৫ দিন / ২৭০ দিন পরে ১৮ই ডিসেম্বর  বিজয়ীর বেশে আবারও সেই ব্লু বার্ড স্কুল /জামিয়া স্কুল এ অবস্থিত থ্রি উইং ই পি আর হেড কোয়াটার কেই ফোর সেক্টর বি, ডি , এফ এর হেড কোয়াটার স্থাপন করেন এবং খাদিমনগরে সেক্টর ট্রুপ্স , ই, পি, আর এবং এক্স পাকিস্তান আর্মির লোকবল দিয়ে থার্টি ওয়ান পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এর সেই স্থলে এইটিন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর বীজ বপন করত - বি ডি এফ বিলুপ্তির পর ২ এপ্রিল ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ রাইফেলস (প্রস্তাবিত)  প্রত্যাবর্তন করেন বিজয়ীর কেতন হাতে নিয়ে । এক পুত্রহারানো অভাগা পিতা সন্তানের আত্মত্যাগের বেদি পেরিয়ে জীবিকা , দায়িত্ব , কর্মজীবন এবং সংসার এর হাল ধরতে যেয়ে পুত্রশোক প্রকাশের অবকাশটাও পেলেন না উপযুক্তভাবে । 



 ( সূত্রঃ  মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টর কম্যান্ডার ও মেজর জেনারেল সি আর দত্ত - তপন কুমার দে ; পৃষ্ঠাঃ সর্বত্র )


 সূত্রঃ (১)  মুক্তিযুদ্ধে রাইফেল ও অন্যান্য বাহিনী - সুকুমার বিশ্বাস ; পৃষ্ঠা - ২২১ । (২) ১৯৭১ রেসিটেন্স, রেজিলিএন্স এন্ড রিডেমসন - মেঃ জেনারেল এমডি সারয়ার হোসেন  ; পৃষ্ঠা -  ৮৬ । মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টর কম্যান্ডার ০ মেজর জেনারেল সি আর দত্ত - তপন কুমার দে; পৃষ্ঠা - ১০০   । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র 




3 views0 comments

Comments


bottom of page